Text size A A A
Color C C C C
পাতা

সাধারণ তথ্য

সামুদ্রিক মৎস্য ও প্রযুক্তি কেন্দ্র, জাতীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের আওতাধীন একটি গবেষণা কেন্দ্র । সামুদ্রিক জলজ সম্পদের সহনশীল আহরণ, মাছ ও চিংড়ির চাষ ব্যবস্থাপনা উন্নয়নে প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং পরিবেশ ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে গবেষণা পরিচালনা করাই এ কেন্দ্রের মুল কর্ম দায়িত্ব।

 

কেন্দ্রের প্রশাসনিক ও গবেষণার সাবির্ক দায়িত্ব মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তার ওপর ন্যস্ত। তাছাড়া ১ জন প্রধান বৈজ্ঞানিক কমর্কর্তা, ২ জন উধ্বর্তনবৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, ৫ জন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এবং প্রায় ২০ জন গবেষণা সহযোগীকর্মকর্তা ও কমর্চারী বতর্মানে কেন্দ্রে কর্মরত।

 

গবেষণা কাযর্ক্রম

বঙ্গোপসাগর পৃথিবীর বৃহৎ ৬৪টি সাগরের মধ্যে অন্যতম যার বাংলাদেশ অংশের আয়তন ১১৮,৮০০ বর্গ কিলোমিটার ।এই জলসীমায় আহরণযোগ্য প্রচুর মৎস্য ও চিংড়ি প্রজাতি ছাড়াও রয়েছে অনাহরিত বিপুল মৎস্য সম্পদ। বতর্মানে বাৎসরিক মোট মৎস্য উৎপাদনের শতকরা ১৭ ভাগের মতো মাছ সামুদ্রিক উৎস থেকে আসছে। আহরণযোগ্য ও অনাহরিত সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদকে জরিপ ও গবেষণার মাধ্যমে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা গেলে এখান থেকে দেশের আমিষ খাদ্য ঘাটতির সিংহভাগ পূরণ করেও অধিক পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব।

 

সামুদ্রিক মৎস্য ও প্রযুক্তি কেন্দ্রে সাম্প্রতিক সময়ে হাঁঙ্গর মৎস্য সম্পদ জরিপ, সী-উইড চাষ ও পণ্য হিসেবে ব্যবহার, শুটকি মাছ উৎপাদনে উন্নত কৌশল উদ্ভাবন, চিংড়ি হ্যাচারীতে রোগ সনাক্তকরণ, প্রচলিত সামুদ্রিক মৎস্য পণ্যের মান উন্নয়ন এবং কাঁকড়া ও অন্যান্য সামুদ্রিক মাছের কৃত্রিম প্রজনন কৌশল উদ্ভাবন বিষয়ক গবেষণা পরিচালিত হচ্ছে। উল্লেখিত গবেষণা কাযর্ক্রমে স্থানীয় মৎস্যজীবি,মৎস্য ব্যবসাযী, শুটকি মহালের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ, চিংড়ি হ্যাচারী সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ সরাসরি সম্পৃক্ত থেকে উন্নত কলাকৌশল সম্পর্কে সাম্যক ধারণা ও প্রশিক্ষণ লাভ করেছেন। বিগত বছরে এ ধরনের উপকারভোগীর সংখ্যা প্রায় ৩০০ জন।

 

অতি সম্পতি কেন্দ্রের বিজ্ঞানীরা দেশে সবর্প্রথম কাঁকড়া পোনা উৎপাদনে সফলতা অজর্ন করেছেন। তাছাড়া কেন্দ্রের প্রযুক্তি সহায়তায় কক্সবাজারে উদ্যোক্তা পযার্য়ে উন্নত শুটকি উৎপাদন কৌশল প্রসার লাভ করেছে।

 

ইতিপূবে কক্সবাজার অঞ্চলে বিভিন্ন মৎস্য অবতরণ স্থলে ১৬ প্রজাতির বাণিজ্যিক গুরুত্বপূর্ণ মাছের মজুদ নিরুপন জরিপে দেখা গেছে যে, ইলিশ সবচেয়ে ধৃত মাছ। তাছাড়া পরিমান বিচারে বিভিন্ন প্রজাতির হাঁঙ্গর, ক্যাটফিস, ম্যাকারেল ও লইট্যা ক্রমান্বয়ে সবার্ধিক ধৃত অন্যান্য সামুদ্রিক মাছ। ইলিশ সারা বছরই ধরা পরলেও সেপ্টম্বর-নভেম্বর সময়ে সবার্ধিক পরিমান ধরা পড়ে। অধিকাংশ সামুদ্রিক মাছ এপ্রিল-জুলাই সময়ে সবর্চ্চো প্রজনন করে থাকে। যদি ও অনেক মাছের ক্ষেত্রে নভেম্বর-ডিসেম্বর সময়ে দ্বিতীয় প্রজননকাল নির্ধারণ করা গেছে।

 

বঙ্গোপসাগরে সামুদ্রিক মৎস্য আহরণে বিশেষ করে আর্টিসানাল আহরণে বেহুন্দি জালের ব্যবহার অন্যতম। সাগর বেহুন্দি জাল মোহনা থেকে ১২০ কিমি. দুরত্বে ব্যবহ্রত হয়। বতর্মানে বেহুন্দি জালের ফাসের আকার সবর্নিম্ম ৪৫ মিমি নিধারর্ণ করা আছে। এ প্রেক্ষাপটে সামুদ্রিক কেন্দ্রের বিজ্ঞানীরা বেহুন্দি জালের গঠনগত পরিবর্তন বিশেষত কড-এন্ড এ একটি ভালদ্দ সংযোজন ও ফাসের আকার ৪৫-৬০ মিমি করে নতুন মডেলের সাগর বেহুন্দি জাল তৈরি করেছে। ফলে সাগরে মাছ আহরণকালে অধিক পরিমানে পরিমানে বড় মাছ ধরার পশাপাশি ছোট ছোট জাল থেকে বেড়িয়ে যেতে পারে যা কিনা টেকসই সামুদ্রিক মৎস্য ব্যবস্থাপনায় অবদান রাখতে পারে।

 

সামুদ্রিক পরিবেশগত গুরুত্বের দিক বিবেচনায় হাঁঙ্গর বঙ্গোপসাগরের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রজাতি। বাংলাদেশে কখনোই চিহ্নিত করে হাঁঙ্গর আহরণ করা হয় না। বতর্মানে হাঙ্গরের আহরণের পরিমান হ্রাস পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ছোট আকৃতির হাঁঙ্গর আহরণ বৃদ্বি পাচ্ছে, যা হাঁঙ্গর জাতীয় মাছের জীব-বৈচিত্রের প্রতি হুমকি নিদের্শ করে। অনেক দেশেই হাঁঙ্গর জাতীয় মাছের সহনশলি আহরণ ও উৎপাদন নিশ্চিত করার জন্য বিভিন্ন ধরনের বিধি-বিষেধ কাযর্কর আছে। FAOবিশ্বব্যাপী হাঁঙ্গরের সহণশীল আহরণ ও সংরক্ষণের লক্ষে ১৯৯৯ সনে একটি আন্তর্জাতিক কম পরিকল্পণা প্রণয়ন করে। উক্ত আন্তর্জাতিক কম পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রতিটি সদস্য রাষ্টের স্ব-স্ব উদ্যোগে ২০০১ সনের মধ্যেই নিজস্ব জলসীমায় হাঁঙ্গরের সহণশীল আহর্রণ ও সংরক্ষণের লক্ষে নিজস্ব জাতীয় কর্ম পরিকল্পণা প্রণয়নের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট আঞ্চলিক BOBLMEপ্রকল্পের সহযোগীতায় মাঠ সমীক্ষা চালিয়ে ও অন্যান্য তথ্য উপাত্ত সংকলন করে হাঁঙ্গরের জন্য একটি খসড়া জাতীয় কম পরিকল্পনা (NPOA-shark) তৈরী করেছে।

 

সামুদ্রিক পরিবেশ নানাভাবে দূষিত হচ্ছে। বছরে প্রায় ৩ লক্ষ মেট্রিক টনের উপরে তৈল ও তৈল জাতীয় পদার্থ সমুদ্রের পানিতে পরে  সমুদ্রের পরিবেশ দুষিত করছে। ইনস্টিটিউটের গবেষনা পযবের্ক্ষনে কক্সবাজার থেকে টেকনাফ পযর্ন্ত সমুদ্রের পানি দূষনমুক্ত বলে বিবেচিত । অন্য দিকে কক্সবাজার টেকনাফ অঞ্চলে সমুদ্রের পানিতে তেল ও গ্রীজের মাত্রা সাধারানত: শীতকালে বেশী দেখা যায়। চট্রগ্রামের কুমরা-ভাটিয়ারী জাহাজভাঙ্গা এলাকার ভারী ধাতুর (heavy metal) মাত্রা উপকুল তথা বঙ্গোপসাগরের জলজ পরিবেশকে দূষিত করছে। পাশ্ববতী ও বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী দেশ সমূহ থেকে সীমানোত্তর দূষন ও আমাদের উপকূল জলসীমায় দূষনের সৃষ্টি করছে। তাই দূষণরোধে কাযর্কর পদক্ষেপ গ্রহন করা একান্ত প্রয়োজন।

 

সী-উইড বিশ্বব্যাপী একটি গুরুত্বপূর্ন জলজ সম্পদ, পুষ্টি মানের বিচারে যা বিভিন্ন দেশে খাদ্য ও শিল্পের কাঁচামাল হিসাবে সমাদৃত। বাংলাদেশের বঙ্গোপসাগরের উপকুলে কক্সবাজার জোলার টেকনাফ সহ সেন্টমাটিন দ্বীপ ও বাঁকখালী মোহনার আশেপপাশের পাথুরে ও প্যারাবন এলাকায় জোয়ার-ভাটার অন্তবর্তী স্থানেই অধিকাংশ সী-উইড         জন্মায়   । সামুদ্রিক মৎস্য ও প্রযুক্তি কেন্দ্র কক্সবাজার হতে ৫টি সী-উইড প্রজাতি Sargassum oligocytum, Enteromorpha intesinalis,Padina tetrastromatica, Caularpa racemosaHypnea musciformis  নিবার্চন করে সেন্টমার্টিন উপকুলে পরীক্ষামূলক ভাবে চাষ করা হচ্ছে। নারিকেলের রশি ও নাইলনের মাছ ধারর জাল ব্যবহার করে হরাইজনটাল নেট পদ্ধতিতে সী-উইড চাষ প্রযুক্তি উদ্ধাবন করা হয়েছে। প্রজাতি ভেদে ৩-৪ মাসের প্রতিবর্গ মিটার জালে কাচা শৈবালের উৎপাদন ৩০-৮০ কেজি। আমাদের জলবায়ুতে স্থানভেদে নভেম্ভর থেকে এপ্রিল পযর্ন্ত  প্রায় ৬ মাস সী-উইড চাষ করা যেতে পারে। তবে সামুদ্রিক শৈবাল চাষের সবোর্চ্চ অনুকুল অবস্থা বিদ্যমান থাকে জানুয়ারী থেকে মার্চ এই ৩ মাস। সাবির্ক দিক বিবেচনায়  বাংলাদেশ উপকুলে সেন্টমার্টিন, টেকনাফ, উখিয়া, কক্সবাজার ও কোয়াকাটা সমূদ্র উপকুলে সী-উইড চাষ  সম্প্রসারন করা গেলে তা উপকৃল বাসীর জন্য বিকল্প আয়ের উৎস হতে পারে।

 

উপকূলীয় এলাকায় সনাতন পদ্ধতিতে শুটকি মাছের গুণগত মান বজায় থাকে না এবং এ পদ্ধতিতে  কীটনাশকের ব্যবহারের কারণে শুটকি মাছের খাদ্যমান নিয়ে আশংকা থেকে যায়। সামুদ্রিক কেন্দ্র  উদ্ভাবিত ফিশ ড্রয়ারে মাধ্যমে অধিক পুষ্টি ও উন্নত গুনগত মান সম্পন্ন শুটকি উৎপাদন করা যায়। যেকোন আবহাওয়া এই ড্রয়ার ব্যবহার করা যায়। তাছাড়া বৃহৎ  পরিসরে বাঁশের মাচা ও জাল ঘেরা পরিবেশে মাছ শুকানোর প্রযুক্তি ব্যবহারে কক্সবাজার শুটকি মহলে কাযর্কর অবদান রাখছে।